
ভাগ্য চক্র
আর. এম. কারিমুল্লাহ
(পর্ব-এক)
গ্রামটার নাম ডাঙাপাড়া, কিন্তু নামের সঙ্গে কোনো মিল নেই, গ্রামের চারিদিকে নদী বিদ্রোহ করে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে…. অন্তিম নেই, মাঝ খানে কয়েকপরিবারের বাস..
করিম ও রহিম নামে দুই ভাই। বাবা- মা মারা গেছে বেশ কয়েক বছর আগে, দুইজনের ছোট্ট ছোট্ট খরকুটো দিয়ে তৈরী বাড়ি…. তাতেই জীবন যাপন করে। প্রতিদিন মাছ ধরেই পেট চালাই, প্রতিদিনের মত সেই দিনও গিয়েছে মাছ ধরতে…..
দাদা, আর কত মাছ ধরে কাটাবো বলতো? এবার তো ভালো একটা কাজের সন্ধান করতে পারি..।
_কাজের সন্ধান! কোথায় করবি? এই মাছ ধরা ছাড়া আমাদের কপালে ভালো কিছু নেই রে…।
রহিম একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে- কি একটা কপাল নিয়ে জন্মেছিলাম কে জানে!
_ এই সব বলে কি কপালের লেখা বদলাতে পারবি? এর চেয়ে ভালো চুপ চাপ কাজ কর কেমন….।
_ দাদা দ্যাখো – কি যেন একটা ভেসে আসছে…
_কি ভেসে আসবে?
_আরে হ্যাঁ হ্যাঁ দ্যাখো, সাদা কি যেন একটা ভেসে আসছে।
_ওটা তো মনে হচ্ছে রাজ হাঁস!
_কিন্তু দাদা , ওটা তো আমাদের নৌকার দিকেই এগিয়ে আসছে।
_তাহলে এখন কি করতে পারি? রাজ হাঁস তো নদীতেই থাকবে এটাই স্বাভাবিক…..।
_আরে না দাদা….
এই বলে রহিম রাজ হাঁসের ছানা টাকে ধরে বলল_দেখেছো দাদা, রাজ হাঁস টা অসুস্থ বলেই আমাদের দিকে আসছিল।
_হাসতে হাসতে বলে- রাজ হাঁসের তুই সেবা করবি নাকি?
_ অবশ্যই করবো……।
_এর থেকে ভালো হয় জবাই করে খেয়ে ফ্যাল….।
_ বিস্মিতভাবে বলে- আরে কি বলছো দাদা? রাজ হাঁস টা অসুস্থ ,কি আবোল তাবোল বলছো তুমি?
ছোট্ট ভাই এর ভালোবাসা দেখে- আচ্ছা ঠিক আছে, তোর যা ভালো লাগে তাই কর……
..……সামনে স্ত্রী দাঁড়িয়ে, এত দেরি তে বাড়ি ফিরতে দেখে রাগম্বিত কণ্ঠে…
_কি হলো তোমার এত দেরি কেন? প্রতিদিন তো দেরি হয় না!
_আরে বলো না, এবার থেকে ভাবছি- রহিম কে না নিয়ে একাই যাবো,ওকে নিয়ে কোনো লাভ হয় না।
_কেন? রহিম আবার কি করলো , তোমার সাথে ঝগড়া ঝাটি করেছে নাকি?
_আরে না, রহিম পরপাকারী তাই না! তাই সবার উপকার করে বেড়াই আর কি।
_আজকে কার উপকার করেছে?
_একটা রাজ হাঁস কে দেখবো পাখা ভাঙা অবস্থায় ভেসে আসছে, তুলে নিয়ে বাড়ি গেল সেবা করবে বলে…..।
_তার মানে রহিম একটা রাজ হাঁস নিয়ে এসেছে?
_হ্যাঁ সেটাই….।
_তুমি ও তো রহিমের সঙ্গে ছিলে! তাহলে রাজ হাঁস টা তুমি না নিয়ে রহিম কে দিয়ে দিলে?
_আরে গিন্নি তুমিও কিনা…..। রাজ হাঁস টা নিয়ে তুমি কি করবে? আমি তো এমনি ইচ্ছে করে আনেনি গো….।
_(রাগম্বিত কণ্ঠে) তুমি কি পাগল হয়ে গেলে নাকি? একটা রাজ হাঁস বিনামূল্যে পেলে, আর হাত ছাড়া করলে? মাংস খাওয়া হত আমাদের!
_তুমি এটা কোনো কথা বললে মাংস খাবে?
_ তা নয় তো কি? তোমার যত বয়স বাড়ছে দিনদিন ততই বুদ্ধি কমছে… তুমি রহিম কে সেটা কেন দিলে?
_ আরে , রহিম তো কুড়িয়ে পেয়েছিল যার কারণে নিয়ে গেছে সে।
_ আমার হয়েছে সব জ্বালা, তোমার মত বুদ্ধিহীন মানুষ কে কি ভাবে সংসার করবো কে জানে….?
_আশ্চর্য…..! এখন আমার কি দোষ হয়ে গেল…! আচ্ছা আমাকে খেতে দাও, খিদে পেয়েছে খুব………।।।।
চারিদিকে সন্ধ্যা নেমে এলো, শিশুরা বাড়ি ঘরে ফিরতে শুরু করল, পাখিদের আনাগোনা শুরু হল…..
রহিম বিছানায় বসে আছে, তার সংসার শুরু হয় নি, হটাৎ শুনতে পেল…
_ এই ছেলে , তুমি তো অনেক ভালো মনের মানুষ! আমি তো এমন ই একজন কে খুঁজছিলাম…।
_(ভয় পেয়ে) কে, কে কথা বলছে? এই ঘরে আমি ছাড়া তো আর কেউ নেই? তাহলে এত রাত্রিবেলা কে কথা বলছে?
_ (গম্ভীর স্বরে) আরে আমি কথা বলছি গো , আমি এই দিকে তাকিয়ে দ্যাখো একবার…!
(চারিদিকে তাকিয়ে) কাউকে তো দেখতে পাচ্ছি না, ভূত এলো নাতো আবার!
_আরে রহিম, আমি রাজ হাঁস কথা বলছি গো…
_রাজ হাঁস কি ভাবে কথা বলে? এটা তো আশ্চর্য জনক বিষয়।
_আশ্চর্য তো, আমি তো কোনো সাধারণ রাজ হাঁস নই, আমি তো আশ্চর্য জনক রাজ হাঁস।
_এটা আবার কেমন কথা , রাজ হাঁস কখনো কথা বলে নাকি?
_এই যে আমি যে ভাবে কথা বলছি তোমার সাথে।
_সত্যি করে বলো তো কে তুমি? আমি তো কখনই দেখিনি একটা রাজ হাঁস কে কথা বলতে….!
_আমি তো সাধারণ হাঁস নই, আমি একটি জাদুর রাজ হাঁস।
কথা টা শুনা মাত্র ই রহিমের চোখ দুটো যেন কপালে উঠে গেল… অন্য মনস্ক ভাবে বলল- জাদু…!
_ হ্যাঁ , জাদু…… আমার কাছে যে যা জিনিস চাই, সে তাই পাই, কিন্তু যে খারাপ ব্যবহার করে তার বিপদ হয়..।
_আমি কি সত্যি দেখছি নাকি কল্পনা! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না…….।
_আরে কল্পনা নয় গো সত্যি, সত্যি তোমার কাছে যদি বিশ্বাস না হয় তাহলে একবার কিছু চেয়ে দেখো….
_ কিন্তু কি চাইবো!
_ তোমার যা প্রয়োজন তুমি চাইতে পারো………।।।