
গল্প
এক গুচ্ছ লাল গোলাপ
ডাঃ এস. এম. নওশের
নিশাত ডাক্তার, তবে সে নিজেকে সেকেন্ড গড বলে মনে করে না। সে জানে, মানুষ বাঁচানো যেমন তার পেশা, তেমনি মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একেকটা মানুষের ভয়, কাঁপুনি, দমবন্ধ হয়ে আসা নিঃশ্বাস—সবই তার কাজের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু একটা কথা সে জানত না, অপারেশন থিয়েটারে প্রেম হয়!
ঘটনাটা ঘটল একদিন ইমার্জেন্সি অপারেশনে। রোগী ছিল এক যুবক, নাম তানভীর। বাইক এক্সিডেন্ট করে এসেছে, মুখে চোখে আতঙ্কের ছায়া। নিশাত দ্রুত প্রস্তুতি নিচ্ছে, নার্সদের নির্দেশ দিচ্ছে, আর তানভীর নিচু গলায় বলছে— “ডাক্তার আপু, বাঁচাবেন তো? আমার মায়ের জন্য বাঁচতে হবে।”
নিশাত মুচকি হাসল— “আমার কাজই তো আপনাকে বাঁচানো। এখন ঘুমিয়ে পড়ুন।”
অপারেশনের সময় তানভীরের হৃদস্পন্দন কিছুটা বেড়ে গিয়েছিল। নিশাত তার হাত ধরে রেখেছিল পেশাদারিত্বের নিয়মেই। কিন্তু তানভীরের অবচেতন মন তখন সেই মুহূর্তের উত্তেজনাকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই ডাক্তার মেয়েটা যেন তার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ, যে তার মৃত্যুর মুখ থেকে টেনে এনে বাঁচিয়ে তুলছে।
অপারেশন শেষে যখন তানভীরের জ্ঞান ফিরল, সে দেখে নিশাত তার পাশে দাঁড়িয়ে। প্রথম বাক্যটাই ছিল— “আপু, আপনি জানেন, আপনার জন্যই আমি বেঁচে আছি।”
নিশাত হেসে বলল— “এটা তো আমার কাজ। আপনার বেঁচে থাকার ইচ্ছে, আর আমাদের টিমওয়ার্কই আপনাকে বাঁচিয়েছে।”
তানভীর মনে মনে ভাবল— এই মেয়েটাকে ছাড়া তার জীবন অসম্পূর্ণ। সে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে নিশাতকে কফির দাওয়াত দিল।
ক্যাফেতে এসে নিশাত দেখল, তানভীর চোখে মুখে একধরণের নিষ্পাপ ভালোলাগার ছায়া নিয়ে বসে আছে। সে বলল— “আপু, সেদিনের আপনার হাতের স্পর্শটা ভুলতে পারছি না। মনে হয়, সেটা প্রেম ছিল।”
নিশাত এবার একটু মজার ভঙ্গিতে বলল— “তানভীর ভাই, এটা যে ‘Misattribution of Arousal’ শুনেছেন কখনো? অপারেশন থিয়েটারের আলো, শরীরের চাপ, মৃত্যুভয়ের উত্তেজনা—এসব মিলে আপনার মস্তিষ্ক বিভ্রান্ত হয়েছে। আপনি ভেবেছেন সেটা প্রেম। আসলে সেটা শুধু আপনার সারভাইভাল মোডের ধোঁকা।”
তানভীর একটু থতমত খেল, তারপর হেসে বলল— “তা হতে পারে। তবে অপারেশন থিয়েটারে প্রেম না হোক, বন্ধুত্ব তো হতে পারে?”
নিশাত বলল— “ভয় ভাগ করা মানুষদের বন্ধুত্বটাই অনেক সময় প্রেমের চাইতে বেশি মূল্যবান।”
কিন্তু এই উত্তরে তানভীর সন্তুষ্ট হয়নি। সে ভেবেছিল, নিশাত হয়তো আস্তে আস্তে তার প্রতি টান অনুভব করবে। সে জানত না, নিশাত কেন এত সহজে তার প্রতি অনুভূতিটাকে ‘ভুল’ বলে উড়িয়ে দিল।
আসলে নিশাতের জন্য বিষয়টা ছিল খুবই পেশাদার। সে এই ধরনের আবেগঘন মুহূর্তে রোগীদের মনের বিভ্রান্তি বহুবার দেখেছে। অপারেশনের সময় হৃদস্পন্দনের ওঠানামা, মৃত্যুভয়, বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা—এসব মিলে মানুষের মন অসতর্ক মুহূর্তে যে কাউকে ‘আপন’ ভাবতে পারে।
নিশাত জানত, এই আবেগ ক্ষণস্থায়ী। সময়ের সাথে সাথে তা মুছে যায়। আর সে নিজেও এমন আবেগে পড়ে ভুল সম্পর্কের বোঝা টানতে চায়নি। তার জীবন অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছিল, ‘তুমি যাকে প্রেম ভাবছ, সে হয়তো আসলে তোমার ভয়ের প্রতিচ্ছবি।’
আরো একটি কারণ ছিল, নিশাত তার জীবনে এমন একবার আবেগের ধোঁকায় পড়ে নিজেকে ঠকিয়েছে। সেই ভুলটা সে দ্বিতীয়বার করতে চায়নি। সে জানত, প্রেম যদি হয়, সেটা হবে সময় নিয়ে, ধীরে ধীরে। অপারেশন থিয়েটারের আলো আর মৃত্যুভয়ের উত্তেজনায় নয়।
তাই সে তানভীরকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিল। সে জানত, এই বন্ধুত্বই সঠিক পথ। প্রেমের ছায়া নয়, বাস্তবের আলোতেই সম্পর্ক গড়া উচিত।
তানভীর বুঝল, জীবনের প্রতিটা আবেগই প্রেম নয়। অনেক সময় পরিবেশ, মুহূর্ত আর মস্তিষ্কের ধোঁকা মিলে এক ধরণের অনুভূতি তৈরি করে, যেটা আমরা প্রেম মনে করি। নিশাত তানভিরের মত আবেগি নয়।জীবন তাকে শিখিয়েছে প্রাক্টিক্যাল হতে
এর মধ্যেই নিশাতের বিসিএস পোস্টিং হয়ে গেল রংপুর মেডিক্যাল কলেজে।নিশাত কে স্টেশনে বিদায় জানাতে এসেছিল তানভির হাতে এক গুচ্ছ লাল গোলাপ।
আজ আগস্টের প্রথম রবিবার।বিশ্ব বন্ধুত্ব দিবস।তাই ভাবলাম তোমাকে বিদায় জানিয়ে ফুল গুলো দিয়ে যাই।
নিশাত বলল থ্যাংক ইউ। ভালো থেকো। নিজের খেয়াল রেখো।আর বিয়ে করলে আমাকে ইনভাইটেশন কার্ড পাঠাতে ভুলো না যেন।